আপডেট

হিজরি নববর্ষ-১৪৪৮ -শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়

জুন ১৭, ২০২৬
হিজরি নববর্ষ-১৪৪৮ -শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়

হিজরি নববর্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকা

হিজরি নববর্ষ বা ইসলামী নববর্ষ হলো ইসলামী চান্দ্র বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ মুহাররম। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করে, কারণ ইসলামী বর্ষপঞ্জি গণনার সূচনা করা হয়েছে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যদিও হিজরি সনের সূচনা হিজরতের বছর থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবে বর্ষপঞ্জিটি প্রবর্তন করা হয় খিলাফতে রাশেদার দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে।

হিজরতের ঐতিহাসিক পটভূমি

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা মক্কা-তে চরম নির্যাতনের শিকার হন। কুরাইশ নেতারা ইসলামের প্রসার ঠেকাতে বিভিন্নভাবে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালায়। এ অবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবিগণ মক্কা থেকে মদিনা-য় হিজরত করেন।

এই হিজরত ছিল শুধু স্থান পরিবর্তন নয়; এটি ছিল ইসলামী সভ্যতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মুসলিম সমাজ গঠনের এক যুগান্তকারী সূচনা। মদিনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুসলিম সমাজকে একটি সুসংগঠিত জাতিতে রূপান্তরিত করেন।

১. হিজরতের মর্যাদা

وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ قُتِلُوا أَوْ مَاتُوا لَيَرْزُقَنَّهُمُ اللَّهُ رِزْقًا حَسَنًا

“আর যারা আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, অতঃপর নিহত হয়েছে অথবা মৃত্যুবরণ করেছে, আল্লাহ অবশ্যই তাদের উত্তম রিযিক দান করবেন।” রেফারেন্স: আল-কুরআন, সূরা আল-হজ্জ (২২), আয়াত: ৫৮

 ২. গারে সাওরের ঘটনা

لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا

“তুমি চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” রেফারেন্স: আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবা (৯), আয়াত: ৪০

৩. মুহাজির ও আনসারদের মর্যাদা

“অগ্রবর্তী প্রথম মুহাজির ও আনসারগণ এবং যারা তাদের উত্তমভাবে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।” রেফারেন্স: আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবা (৯), আয়াত: ১০০

৪. ইসলামী বর্ষপঞ্জির ভিত্তি

“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি…” রেফারেন্স: আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবা (৯), আয়াত: ৩৬

 হাদিসের দলিল

১. হিজরতের উদ্দেশ্য ও নিয়তের গুরুত্ব

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

“সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল…”

রেফারেন্স:

  • সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং: ১
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯০৭

২. গারে সাওরে রাসূল (সা.) ও আবু বকর (রা.)

হযরত আবু বকর (রা.) বলেন:

“আমি গুহায় নবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমি বললাম, তারা যদি নিজেদের পায়ের দিকে তাকায়, তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে। নবী (সা.) বললেন, ‘হে আবু বকর! এমন দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ?’”

রেফারেন্স:

  • সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং: ৩৬৫৩
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৩৮১

৩. হিজরতের ফজিলত

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ حَتَّى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ

“তাওবার দরজা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হিজরত বন্ধ হবে না।”

রেফারেন্স:

  • সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৪৭৯
  • মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নং: ১৬৭১

হিজরি সন প্রবর্তনের কারণ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে কিংবা আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর খেলাফতকালে কোনো আনুষ্ঠানিক ইসলামী বর্ষপঞ্জি ছিল না। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দ্বারা সময় নির্ধারণ করা হতো।

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে প্রশাসনিক কাজকর্ম বৃদ্ধি পেলে তারিখ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়। ইরাক-এর গভর্নর আবু মুসা আল-আশআরী (রা.) একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে বিভিন্ন আদেশপত্রে তারিখ না থাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।

এরপর খলিফা উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সেখানে বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়:

  • রাসূল (সা.)-এর জন্ম সাল থেকে গণনা।
  • নবুওয়াত প্রাপ্তির সাল থেকে গণনা।
  • ওফাতের সাল থেকে গণনা।
  • হিজরতের সাল থেকে গণনা।

দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতের ঘটনাকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

হিজরি সন প্রবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স

১. হিজরি সন চালুর সিদ্ধান্ত

খলিফা উমর (রা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে হিজরতকে ইসলামী সনের সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করেন।

রেফারেন্স:

  • ফাতহুল বারী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৬৮
  • তারিখ আত-তাবারী, খণ্ড ২, ঘটনা: ১৭ হিজরি

২. আবু মূসা আশআরী (রা.)-এর চিঠি

তিনি উমর (রা.)-কে লিখেন:

“আমাদের কাছে আপনার চিঠি আসে, কিন্তু তাতে তারিখ থাকে না।”

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের আলোচনা শুরু হয়।

রেফারেন্স:

  • তারিখ আত-তাবারী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৮-৩৯০
  • আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫১

কেন হিজরতকে ভিত্তি ধরা হলো?

সাহাবিগণ উপলব্ধি করেছিলেন যে হিজরত ইসলামের ইতিহাসে একটি সুস্পষ্ট মোড় পরিবর্তনের ঘটনা।

হিজরতের মাধ্যমে—

  1. মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার সুযোগ লাভ করেন।
  2. ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
  3. মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি অর্জন করে।
  4. ইসলাম বিশ্বব্যাপী বিস্তারের ভিত্তি রচিত হয়।

তাই ইসলামের বিজয় ও প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে হিজরতকে বর্ষগণনার ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়।

৩. হিজরতকে সনের সূচনা নির্ধারণ

হযরত আলী (রা.)-এর পরামর্শে হিজরতের বছরকে ইসলামী সনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

রেফারেন্স:

  • আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫২
  • আল-কামিল ফিত তারিখ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭১

মুহাররম মাসকে প্রথম মাস নির্ধারণ

প্রশ্ন হতে পারে, হিজরত তো সংঘটিত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে, তাহলে মুহাররমকে কেন প্রথম মাস করা হলো?

এ বিষয়ে সাহাবিদের মতামত ছিল যে ঈদুল আজহা এবং হজের কার্যক্রম শেষে মুহাররম মাস থেকেই নতুন পরিকল্পনা ও নতুন বছরের সূচনা উপযোগী। এছাড়া আরবদের প্রচলিত বর্ষপঞ্জিতেও মুহাররম ছিল বছরের প্রথম মাস।

সুতরাং হিজরতের ঘটনাকে ভিত্তি ধরা হলেও বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হিসেবে মুহাররম নির্ধারণ করা হয়।

হিজরি বর্ষপঞ্জির বৈশিষ্ট্য

হিজরি সন সম্পূর্ণরূপে চন্দ্রচক্রভিত্তিক।

বছরে ১২টি মাস:

  1. মুহাররম
  2. সফর
  3. রবিউল আউয়াল
  4. রবিউস সানি
  5. জমাদিউল উলা
  6. জমাদিউস সানিয়া
  7. রজব
  8. শাবান
  9. রমজান
  10. শাওয়াল
  11. জিলকদ
  12. জিলহজ

একটি হিজরি বছর সাধারণত ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনের হয়, যা সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১০–১১ দিন কম।

হিজরি নববর্ষের তাৎপর্য

হিজরি নববর্ষ মুসলমানদের জন্য শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি ত্যাগ, সংগ্রাম, ঈমান, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর ভরসার এক ঐতিহাসিক শিক্ষার স্মারক।

হিজরতের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়

  • সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
  • আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে।
  • প্রতিকূলতার মধ্যেও আদর্শে অবিচল থাকতে হবে।
  • ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে।
হোয়াটসাঅ্যাপ চ্যাট
মেসেঞ্জার চ্যাট
লোডিং হচ্ছে...